

মিফতাহুল জান্নাত প্রিয়ন্তী
আজ মিতুর সাত বছর পূর্ণ হলো। সকাল থেকেই মিতু দেখছে তাদের বাড়িতে চারদিকে বেশ ব্যস্ততা আর হৈচৈ চলছে। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে, তা সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না।
তার মা সাহেলা বেগম সকাল থেকেই নফল নামাজ পড়ছিলেন। নামাজ শেষ করেই তিনি তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে চলে গেলেন নানা রকম আয়োজন করতে। একটু পর মিতু দেখলো তার বড় ভাই হাট থেকে কয়েকটি গাছের চারা নিয়ে বাড়িতে ঢুকছে। অন্যদিকে তার বাবাও সকাল থেকে একের পর এক ফোন করছেন।
চারদিকে যেন এক অদ্ভুত ব্যস্ততা। ছোট্ট মিতু অবাক হয়ে সবকিছু দেখছে, কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না—আজ কী ঘটতে যাচ্ছে!
ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে মিতুর বড় আপা ঋতু কুরআন তিলাওয়াত শেষ করে মিতুর কাছে এসে বসলো। সে মিতুর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললো,
— কী হয়েছে আমাদের ছোট্ট মণির? একা একা বসে আছো কেন?
মিতু একটু অভিমানী গলায় বললো,
— আপা, সকাল থেকে সবাই এত ব্যস্ত কেন? বাবা তো আজ দোকানেও গেলেন না!
(মিতুর বাবা আহমেদ সাহেব একজন বড় সোনার দোকানের মালিক।)
ঋতু আপা একটু হেসে বললো,
— কেন মিতু, তোমার মনে নেই আজ কী দিন?
মিতু কিছু বলার আগেই তার বড় ভাই ঘরে ঢুকে বললো,
— আজকের এই দিনে আল্লাহ তোমাকে আমাদের পরিবারে পাঠিয়েছিলেন। আজ তোমার জন্মদিন।
এই কথা শুনে মিতুর চোখ আনন্দে ঝলমল করে উঠলো। সে খুশি হয়ে বললো,
— তাহলে কি আজ আমরা কেক কাটবো? অনেক মজা করবো? যেমন গতবার রুহি তার জন্মদিনে করেছিল!
ভাইয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে মমতা ভরা কণ্ঠে বললো,
— না মিতু, আমরা আজ সেরকম কিছু করবো না। আজ তুমি আমাদের কাছে এসেছিলে—এটা আমাদের জন্য অনেক বড় আনন্দের দিন। কিন্তু এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা জীবনের পথ ধরে আরেক ধাপ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেলাম। তাই আমরা আজ এমন কিছু ভালো কাজ করবো, যাতে আল্লাহ খুশি হন এবং তোমার আমলনামা নেকিতে ভরে যায়।
মিতু কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
— তাহলে আমরা আজ কী করবো?
ঋতু আপা মিষ্টি হেসে বললো,
— সেই কারণেই তো সবাই এত ব্যস্ত। বাবার ইচ্ছে আজ এলাকার দরিদ্র মানুষদের একবেলা পেট ভরে খাওয়াবেন। এতে তারা খুশি হবে, আর আল্লাহও আমাদের ওপর সন্তুষ্ট হবেন। তখন তিনি আমাদের রিজিকে আরো বেশি বরকত ও রহমত দান করবেন।
ভাইয়া বললো,
— আর তোমার সপ্তম জন্মদিন উপলক্ষে আমি সাতটি গাছের চারা এনেছি। আমরা সেগুলো লাগাবো।
মিতু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
— গাছ লাগালে কী হবে?
ভাইয়া হাসিমুখে বললো,
— এই গাছগুলো একদিন বড় হবে। এতে ফল ধরবে। তখন আমরা টাটকা ফল খেতে পারবো, আবার গরিব মানুষদেরও খাওয়াতে পারবো। শুধু তাই নয়, পাখিরাও এসে এই ফল খাবে। যতদিন এই গাছ থেকে কেউ উপকার পাবে, ততদিন আমরা নেকি পেতে থাকবো।
এ কথা শুনে মিতুর মুখে আনন্দের হাসি ফুটে উঠলো। সে বললো,
— তাহলে তো মানুষের উপকার করেই আমরা আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে পারি!
ঠিক তখনই যোহরের আজান ভেসে এলো। সবাই নামাজ পড়তে চলে গেল।
নামাজ শেষে মিতুর বাবা আহমেদ সাহেব রান্নাঘরে গিয়ে বাবুর্চির কাছে রান্নার খোঁজ নিতে লাগলেন। সেখানে গিয়ে তিনি লক্ষ্য করলেন, বাবুর্চি ভালো গোশতের টুকরোগুলো আলাদা করে রাখছে এবং হাড় ও কম গোশত অন্য প্লেটে দিচ্ছে।
এটা দেখে আহমেদ সাহেব বললেন,
— ভাইজান, আপনি এমন করছেন কেন?
হঠাৎ ধরা পড়ে বাবুর্চি লজ্জায় চুপ করে রইলো।
আহমেদ সাহেব শান্ত কণ্ঠে বললেন,
— দেখুন ভাইজান, এভাবে গোপনে এমন কাজ করা ঠিক নয়। হয়তো আপনি ভুলে গিয়েছিলেন—আল্লাহ সবকিছু দেখেন। আর তিনি অন্যায়কে কখনোই পছন্দ করেন না।
এই কথা শুনে বাবুর্চি লজ্জিত হয়ে বললো,
— আমার খুব বড় ভুল হয়ে গেছে। আমাকে ক্ষমা করে দিন। এমন ভুল আর কখনো হবে না।
এরপর সে নিজেই দায়িত্ব নিয়ে দরিদ্র মানুষদের যত্ন করে খাবার পরিবেশন করলো। গরিব-দুঃখীরা এত আন্তরিকতা পেয়ে খুব খুশি হলেন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন—এই পরিবারের ওপর যেন সবসময় রহমত ও বরকত বর্ষিত হয়।
এভাবেই ভালো কাজ, দয়া এবং মানুষের উপকারের মধ্য দিয়ে মিতুর পরিবার খুব সুন্দরভাবে মিতুর জন্মদিন উদযাপন করলো।
| নিজের লেখা প্রকাশ করতে মেসেজ করুন > What'sApp |
সম্পাদক ও প্রকাশক মোঃ নাহিদ হাসান প্রধান
Copyright © 2024 Chirkute Sahitto. Powered by Chirkute Team.