অদৃশ্য কারিগর: গৃহিণী মায়ের অবৈতনিক শ্রম ও আমাদের দায়

অদৃশ্য কারিগর: গৃহিণী মায়ের অবৈতনিক শ্রম ও আমাদের দায়

প্রতিবছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার আমরা ঘটা করে মা দিবস পালন করি। সোশ্যাল মিডিয়ায় মায়ের সাথে হাসিমুখে তোলা সেলফি আর আবেগী স্ট্যাটাসে ভরে যায় টাইমলাইন। কিন্তু এই একদিনের উৎসবের আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে একজন গৃহিণী মায়ের ৩৬৫ দিনের হাড়ভাঙা খাটুনি। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় মায়ের ভালোবাসাকে আমরা যতটা মহিমান্বিত করি, তার দৈনন্দিন শ্রমকে ঠিক ততটাই অবমূল্যায়ন করি। একজন মা যখন ঘর সামলান, তখন সমাজ খুব সহজেই বলে দেয় ‘তিনি কিছু করেন না, ঘরেই থাকেন।’ এই একটি বাক্যেই মুছে ফেলা হয় তার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অবিরাম কাজের তালিকা। অথচ অর্থনীতির ভাষায়, গৃহিণী মায়ের এই কাজগুলো হলো ‘কেয়ার ইকোনমি’ বা সেবামূলক শ্রম, যা অদৃশ্য হলেও একটি দেশের উন্নয়নের মূল ভিত্তি।

শ্রমের বাজারমূল্য বনাম মায়ের মমত্বযদি আমরা আবেগের চশমা সরিয়ে একটু বাস্তবতার দিকে তাকাই, তবে দেখা যাবে একজন মা একই সাথে রাঁধুনি, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, শিক্ষক, ডাক্তার এবং একজন দক্ষ ব্যবস্থাপক। যদি এই প্রতিটি কাজের জন্য বাইরের পেশাদার লোক নিয়োগ করা হতো, তবে মাস শেষে সেই পারিশ্রমিক কয়েক হাজার ছাড়িয়ে লক্ষাধিক টাকা হতো। কিন্তু মা যখন এই কাজগুলো করেন, তখন তাকে ‘পারিবারিক দায়িত্ব’ বা ‘মায়ের মমতা’র তলে আড়াল করে দেওয়া হয়। এই ‘অবৈতনিক’ তকমাটি মাকে মানসিকভাবে পরনির্ভরশীল করে রাখে। নিজের ছোট একটি শখ পূরণ করতেও তাকে অনেক সময় পরিবারের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা তার আত্মমর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে।বিশ্রামহীন এক জীবনএকজন চাকুরিজীবী মানুষের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা থাকে, শুক্রবার বা শনিবার ছুটির দিন থাকে। কিন্তু একজন গৃহিণী মায়ের কি কোনো সাপ্তাহিক ছুটি আছে? অসুস্থ শরীর নিয়ে যখন তিনি হেঁশেলের ধোঁয়া সয়ে রান্না করেন, তখন কি আমরা একবারও ভাবি যে তারও একটু বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল? আধুনিক জীবনের যান্ত্রিকতায় আমরা মাকে অনেকটা রোবটের মতো ভাবা শুরু করেছি, যার প্রধান কাজই হলো সবার সেবা নিশ্চিত করা।প্রয়োজন স্বীকৃতি ও অংশীদারিত্বমা দিবস কেবল দামী উপহার দেওয়া বা রেস্টুরেন্টে ডিনার করানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। প্রকৃত সম্মান হবে যদি আমরা তার শ্রমের স্বীকৃতি দিই। জিডিপিতে (GDP) নারীর ঘরের কাজের আর্থিক মূল্যায়নের আলোচনা আজ বিশ্বজুড়ে জোরালো হচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আগে ঘর থেকে স্বীকৃতি শুরু হওয়া জরুরি। ‘গৃহিণী’ পরিচয়টি যে কোনো ছোট কাজ নয়, বরং একটি পরিবার গঠনের প্রধান কারিগর এই মানসিকতা আমাদের গড়ে তুলতে হবে।

আরো পড়ুনঃ  আমাদের মা'দের আত্মত্যাগ

মায়ের ভালোবাসা অমূল্য, কিন্তু তার শ্রম কোনোভাবেই ‘মূল্যহীন’ নয়। গৃহিণী মাকে অবৈতনিক শ্রমের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে হলে ঘরোয়া কাজে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও এগিয়ে আসতে হবে। রান্নাবান্না বা ঘর পরিষ্কার রাখা কেবল নারীর কাজ এই প্রাচীন ধ্যানধারণা থেকে বেরিয়ে আসার সময় এসেছে। মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটুক প্রতিদিনের কাজে তার পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে।

মাহজাবীন তাসনীম রুহী
শিক্ষার্থী: এম সি কলেজ সিলেট
অনার্স ২য় বর্ষ,রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *