
ধনী হওয়ার গল্প শুনিয়ে নিজেই ১২০ কোটি ডলার ঋণে! রবার্ট কিয়োসাকির অদ্ভুত এক কৌশল
যিনি বিশ্ববাসীকে শিখিয়েছেন কীভাবে আর্থিক স্বাধীনতা অর্জন করতে হয় এবং কীভাবে ধনী হতে হয়, তিনি নিজেই এখন বিশাল ঋণের সাগরে ডুব দিয়ে আছেন। কথা হচ্ছে বিশ্বখ্যাত পার্সোনাল ফিন্যান্স বই ‘রিচ ড্যাড, পুওর ড্যাড’ (Rich Dad Poor Dad)-এর লেখক রবার্ট কিয়োসাকি (Robert Kiyosaki)-কে নিয়ে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই প্রকাশ করেছেন যে, তার ঘাড়ে বর্তমানে ১.২ বিলিয়ন বা ১২০ কোটি ডলারের ঋণের বোঝা রয়েছে।
যে মানুষটির লেখা বই পড়ে কোটি কোটি মানুষ ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন, তার নিজের এই বিপুল পরিমাণ ঋণ সাধারণ মানুষকে রীতিমতো চমকে দিয়েছে। তবে কিয়োসাকির দাবি—এই ঋণ তার দেউলিয়া হওয়ার লক্ষণ নয়, বরং এটি তার ধনী হওয়ার একটি অন্যতম গোপন কৌশল!
ঋণ কেন কিয়োসাকির কাছে সম্পদ?
সাধারণত আমরা ঋণ বা ধার-দেনাকে একটি বড় মানসিক ও আর্থিক বোঝা মনে করি। কিন্তু রবার্ট কিয়োসাকির আর্থিক দর্শন একদমই আলাদা। তিনি ঋণকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করেন: ‘ভালো ঋণ’ (Good Debt) এবং ‘খারাপ ঋণ’ (Bad Debt)।
- খারাপ ঋণ: যে ঋণ নিয়ে গাড়ি, দামি গ্যাজেট বা বিলাসবহুল জিনিস কেনা হয়, যা পকেট থেকে শুধু টাকা বের করে নেয় কিন্তু কোনো আয় করে না।
- ভালো ঋণ: যে ঋণ ব্যবহার করে নতুন সম্পদ তৈরি করা হয় এবং যা প্রতি মাসে পকেটে লভ্যাংশ বা ক্যাশফ্লো (Cash Flow) নিয়ে আসে।
কিয়োসাকির মতে, তার ১.২ বিলিয়ন ডলারের পুরো ঋণটাই হলো ‘ভালো ঋণ’। এই টাকা তিনি ব্যক্তিগত ভোগবিলাসে খরচ না করে এমন জায়গায় বিনিয়োগ করেছেন যা তাকে আরও ধনী বানাচ্ছে।
কোথায় বিনিয়োগ হয়েছে এই বিপুল অর্থ?
ব্যাংক থেকে নেওয়া এই বিশাল অঙ্কের অর্থ রবার্ট কিয়োসাকি মূলত তিনটি প্রধান খাতে বিনিয়োগ করেছেন:
- রিয়েল এস্টেট (আবাসন ব্যবসা): কিয়োসাকির আয়ের একটি বড় অংশ আসে রিয়েল এস্টেট থেকে। তিনি ব্যাংক থেকে কম সুদে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বড় বড় বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন কিনেছেন। সেইসব সম্পত্তির ভাড়া থেকে আসা টাকা দিয়ে তিনি ব্যাংকের কিস্তিও পরিশোধ করছেন এবং নিজের পকেটেও মোটা অঙ্কের মুনাফা তুলছেন।
- সোনা ও রুপা (Precious Metals): কিয়োসাকি কাগজের মুদ্রা বা ক্যাশ টাকার ওপর একদমই ভরসা করেন না। তাই তিনি ঋণের টাকা দিয়ে বিপুল পরিমাণ সোনা ও রুপা কিনে রেখেছেন, যা মুদ্রাস্ফীতির বাজারেও তার সম্পদের মূল্য ধরে রাখছে।
- বিটকয়েন ও ক্রিপ্টোকারেন্সি: বর্তমান যুগের ডিজিটাল সোনা হিসেবে পরিচিত বিটকয়েনেও তিনি একটি বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছেন।
ট্যাক্স বা কর বাঁচানোর আইনি কৌশল
রবার্ট কিয়োসাকির এই ঋণ কৌশলের পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর বা ট্যাক্স আইন। আমেরিকার আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি ঋণ নিয়ে সেই টাকা ব্যবসা বা রিয়েল এস্টেটের মতো উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করেন, তবে তিনি বিপুল পরিমাণ ট্যাক্স ছাড় পান।
কিয়োসাকি নিজেই স্বীকার করেছেন, তিনি বৈধভাবে সরকারের ট্যাক্স দেওয়া এড়াতে এই ঋণের ফাঁদ ব্যবহার করেন। নগদ টাকা আয় করলে যেখানে সরকারকে বড় অঙ্কের ট্যাক্স দিতে হতো, সেখানে ঋণের টাকায় সম্পদ গড়ে তিনি কোটি কোটি ডলার ট্যাক্স বাঁচাচ্ছেন।
“টাকা জমানো বোকামি” – কিয়োসাকির দর্শন
কিয়োসাকি সবসময় বলেন, “সেভার্স আর লুজার্স” (Savers are Losers) অর্থাৎ যারা ব্যাংকে টাকা জমিয়ে রাখেন তারা আসলে দিন দিন গরিব হচ্ছেন। এর কারণ হলো মুদ্রাস্ফীতি (Inflation)। প্রতি বছর যেভাবে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, তাতে ব্যাংকে পড়ে থাকা অলস টাকার মান কমছে।
তাই তিনি নিজে কোনো ক্যাশ টাকা জমান না। ব্যাংকে টাকা রাখার বদলে তিনি ব্যাংক থেকে টাকা ধার নেন এবং তা দিয়ে এমন সম্পদ কেনেন যার দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
ব্যাংক দেউলিয়া হলে দায় কার?
অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন, যদি কোনো কারণে কিয়োসাকির এই বিশাল সাম্রাজ্য ধসে পড়ে, তবে কী হবে? এই বিষয়ে কিয়োসাকির উত্তর বেশ সোজাসাপ্টা। তিনি জানান, এই ঋণগুলো তার ব্যক্তিগত নামে নয়, বরং বিভিন্ন কর্পোরেট বা কোম্পানির নামে নেওয়া।
যদি কখনো ব্যবসা পুরোপুরি ব্যর্থও হয়, তবে আইনগতভাবে কোম্পানি দেউলিয়া হবে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে নন। কিয়োসাকির ভাষায়, “আমি যদি দেউলিয়া হই, তবে সেই সমস্যা আমার নয়, সেই সমস্যা ব্যাংকের।”
শেষ কথা
রবার্ট কিয়োসাকির এই ১.২ বিলিয়ন ডলার ঋণের গল্পটি সাধারণ মানুষের জন্য একটি বড় শিক্ষণীয় বিষয়। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সঠিক আর্থিক শিক্ষা বা ‘ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি’ থাকলে ঋণকেও সম্পদ বানানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য পর্যাপ্ত জ্ঞান ও ব্যাকআপ প্ল্যান ছাড়া এই ধরণের ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল অনুসরণ করা মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে।




